
পবিত্র ওমরাহ পালন করা প্রতিটি মুসলমানের জন্য অত্যন্ত আবেগ এবং সৌভাগ্যের বিষয়। ওমরাহ করার জন্য ২০২৬ সালে সৌদি সরকার তাদের নিয়মকানুন অনেকটাই সহজ ও ডিজিটাল করেছে। বাংলাদেশ থেকে যারা ওমরাহ করার পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য ভিসা, খরচ, ইহরামের নিয়ম এবং চেকলিস্টসহ একটি সম্পূর্ণ গাইড নিচে দেওয়া হলো।
১. ওমরাহ ভিসা (Umrah Visa)
বর্তমানে বাংলাদেশিরা মূলত দুইভাবে ওমরাহ ভিসা সংগ্রহ করতে পারেন:
- ওমরাহ ই-ভিসা (Umrah e-Visa): এটি সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সহজ মাধ্যম। সৌদি হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয়ের অফিশিয়াল অ্যাপ বা অনুমোদিত এজেন্সির মাধ্যমে এই ভিসা নেওয়া যায়। এর মেয়াদ থাকে ৯০ দিন এবং এই ভিসা দিয়ে মক্কা-মদিনা ছাড়াও সৌদির যেকোনো শহরে ঘুরে আসা যায়।
- সৌদি ট্রানজিট ভিসা (Transit/Stopover Visa): আপনি যদি সৌদি এয়ারলাইন্স বা ফ্লাইনাস (Flynas)-এর টিকিট কাটেন এবং সৌদি আরব হয়ে অন্য কোনো দেশে যান, তবে সম্পূর্ণ ফ্রি ৯৬ ঘণ্টার ট্রানজিট ভিসা পাবেন। এই ৪ দিনে আপনি ওমরাহ সম্পন্ন করে অন্য দেশে চলে যেতে পারবেন।
২. প্রয়োজনীয় কাগজপত্র (Required Documents)
ওমরাহ ভিসার আবেদন এবং ভ্রমণের জন্য নিচের কাগজগুলো প্রস্তুত রাখতে হবে:
- পাসপোর্ট: মূল পাসপোর্টের মেয়াদ সৌদি আরব পৌঁছানোর দিন থেকে সর্বনিম্ন ৬ মাস থাকতে হবে।
- ছবি: সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডের পাসপোর্ট সাইজের সদ্য তোলা রঙিন ছবি (ল্যাব প্রিন্ট)।
- টিকিট ও হোটেল বুকিং: কনফার্মড রিটার্ন এয়ার টিকিট এবং মক্কা-মদিনার হোটেল বুকিংয়ের কপি।
- টিকা সার্টিফিকেট (যদি প্রযোজ্য হয়): সাধারণত মেনিনজাইটিস এবং কোভিড-১৯ টিকার আপডেট সার্টিফিকেট সাথে রাখা নিরাপদ।
- মাহরামের নিয়ম (নারী যাত্রীদের জন্য): ২০২৬ সালের বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, নারীরা মাহরাম (পুরুষ অভিভাবক) ছাড়াও ওমরাহ করতে যেতে পারবেন। তবে দলগত বা এজেন্সির মাধ্যমে যাওয়াটা নিরাপত্তার জন্য ভালো।
৩. ইহরামের নিয়ম (Ihram Rules)
ওমরাহ’র প্রথম এবং প্রধান শর্ত হলো মিকাত (নির্দিষ্ট সীমানা) অতিক্রম করার আগেই ইহরামের নিয়ত করা। বাংলাদেশ থেকে সরাসরি জেদ্দা যাওয়ার পথে বিমানের ভেতরেই মিকাত পড়ে, তাই ঢাকা এয়ারপোর্ট থেকেই ইহরামের কাপড় পরে নেওয়া সবচেয়ে সুবিধাজনক।
ইহরামের প্রস্তুতি ও নিয়ত:
১. নখ, চুল কেটে ভালোভাবে গোসল বা ওজু করে নিন।
২. পুরুষরা সেলাইবিহীন দুটি সাদা কাপড় (একরকম চাদর) পরিধান করবেন। নারীরা স্বাভাবিক সেলাইযুক্ত ঢিলেঢালা শালীন পোশাক ও হিজাব পরবেন (মুখমণ্ডল ও হাতের কব্জি খোলা থাকবে)।
৩. মিকাত আসার পূর্বে ২ রাকাত নফল নামাজ পড়ে ওমরাহ’র নিয়ত করবেন:
“লাব্বাইকাল্লা-হুম্মা উমরাতান” (হে আল্লাহ, আমি ওমরাহ’র উদ্দেশ্যে লব্বাইক বলছি)।
৪. নিয়ত করার পর থেকে বেশি বেশি তালবিয়াহ পাঠ করবেন:
“লাব্বাইকাল্লা-হুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারীকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারীকা লাক।”
ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজসমূহ:
- যেকোনো ধরণের সুগন্ধি, আতর, সুগন্ধি সাবান বা শ্যাম্পু ব্যবহার করা।
- পুরুষদের জন্য মাথা ঢাকা বা সেলাই করা পোশাক/অন্তর্বাস পরা।
- শরীরের কোনো অংশের চুল, দাড়ি বা নখ কাটা/উপড়ানো।
- কোনো জীবজন্তু শিকার করা বা গাছের পাতা ছেঁড়া।
- স্ত্রী সহবাস বা কামোদ্দীপক কোনো আচরণ/কথাবার্তা বলা।
💰 ওমরাহ খরচ (Estimated Cost from Bangladesh)
২০২৬ সালের বর্তমান বিমান ভাড়া এবং সৌদির হোটেল খরচের ওপর ভিত্তি করে প্যাকেজের আনুমানিক হিসাব নিচে দেওয়া হলো:
- ইকোনমি প্যাকেজ (৩ স্টার হোটেল, একটু দূরত্বে): জনপ্রতি ১,১৫,০০০ – ১,৩০,০০০ টাকা (১৪ দিনের জন্য, শেয়ারিং রুম)।
- স্ট্যান্ডার্ড প্যাকেজ (৪ স্টার হোটেল, হরমের কাছাকাছি): জনপ্রতি ১,৪০,০০০ – ১,৬৫,০০০ টাকা।
- ব্যক্তিগতভাবে (নিজে নিজে করলে):
- রিটার্ন বিমান ভাড়া: ৭০,০০০ – ৮৫,০০০ টাকা (এয়ারলাইন্স ও বুকিংয়ের সময়ের ওপর নির্ভরশীল)।
- ভিসা ফি: ১৫,০০০ – ১৮,০০০ টাকা (এজেন্সি ও ইন্স্যুরেন্স ফি সহ)।
- খাবার ও লোকাল যাতায়াত: প্রতিদিন গড়ে ১,৫০০ – ২,০০০ টাকা।
📋 ওমরাহ ট্রাভেল চেকলিস্ট (Checklist)
যাওয়ার আগে ব্যাগে সব গুছিয়ে নিয়েছেন কিনা তা এই চেকলিস্টের সাথে মিলিয়ে নিন:
জরুরি কাগজপত্র (মূল ও ফটোকপি)
- [ ] পাসপোর্ট এবং ওমরাহ ভিসার প্রিন্ট কপি।
- [ ] বিমান টিকিট এবং হোটেল ভাউচার।
- [ ] ডলার বা সৌদি রিয়াল (বাংলাদেশ থেকে কিছু রিয়াল ক্যাশ নেওয়া ভালো)।
- [ ] পাসপোর্টের ছবির কয়েকটি কপি ও জাতীয় পরিচয়পত্র (NID)।
পোশাক-আশাক ও জুতো
- [ ] পুরুষদের জন্য কমপক্ষে ২ সেট ইহরামের কাপড় এবং বেল্ট।
- [ ] সাধারণ ব্যবহারের জন্য ৪-৫ সেট আরামদায়ক সুতি পোশাক (লুঙ্গি/পায়জামা-পাঞ্জাবী)।
- [ ] নারীদের জন্য ৪-৫ সেট সুতি সেলোয়ার-কামিজ বা আবায়া/বোরকা এবং আরামদায়ক সুতি হিজাব।
- [ ] তাওয়াফের সময় পরার জন্য পাতলা সুতি মোজা।
- [ ] সহজে খোলা ও পরা যায় এমন নরম জুতো বা স্যান্ডেল (বেশি হাঁটার জন্য স্পোর্টস শু বা কেডস সাথে রাখতে পারেন)।
পার্সোনাল কেয়ার ও ওষুধ (সুগন্ধিমুক্ত)
- [ ] সুগন্ধি ছাড়া সাবান, শ্যাম্পু এবং লোশন (ইহরাম অবস্থার জন্য)।
- [ ] টুথব্রাশ ও পেস্ট।
- [ ] ভ্যাসলিন বা অলিভ অয়েল (পায়ের গোড়ালি বা উরুর চামড়া ছিলে যাওয়া রোধ করতে)।
- [ ] প্রয়োজনীয় ওষুধ: গ্যাস্ট্রিক, প্যারাসিটামল, কাশির ওষুধ, ওআরএস স্যালাইন, পেইন কিলার এবং আপনার নিয়মিত কোনো প্রেসক্রিপশনের ওষুধ।
অন্যান্য জিনিসপত্র
- [ ] ছোট একটি কাঁচি (ওমরাহ শেষে চুল কাটার/হালাল হওয়ার জন্য)।
- [ ] গলার ব্যাগ (পাসপোর্ট, টাকা ও হোটেলের কার্ড সবসময় সাথে রাখার জন্য)।
- [ ] জুতো রাখার জন্য একটি ছোট কাপড়ের ব্যাগ (হারাম শরিফে ঢোকার সময় জুতো ব্যাগে ভরে সাথে রাখা যায়)।
- [ ] পাওয়ার ব্যাংক ও ট্রাভেল অ্যাডাপ্টার (মোবাইল চার্জের জন্য)।
- [ ] পকেট সাইজ দোয়ার বই বা ওমরাহ গাইডের ছোট বই।
বিশেষ পরামর্শ: মক্কা ও মদিনায় প্রচুর হাঁটতে হয়। তাই ওমরাহ’র মূল আনুষ্ঠানিকতা (তাওয়াফ ও সাঈ) করার সময় শরীরকে হাইড্রেটেড রাখতে প্রচুর জমজমের পানি পান করুন এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের দিকে নজর দিন।